অপরিকল্পিত ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ বাড়াচ্ছে করোনার ঝুঁকি

Spread the love
  • 2
    Shares

‘ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন’- এমন স্লোগান নিয়ে গত ২৬ মার্চ থেকে দুই দফায় ১৪ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা ও সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল জনসমাগম ও গণজমায়েত এড়ানো। এমনকি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি ছুটি বাড়িয়েছে। ঢাকায় আসা-যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়াসহ অনেক জেলা-উপজেলা ও এলাকা লকডাউনও করা হয়েছে। এর আগে ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানসহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আসন্ন শবেবরাত ও বাংলা নববর্ষের সব ধরনের আয়োজনও। যেহেতু করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক এখন আবিস্কার হয়নি, তাই ঘরে থাকাকেই প্রধান প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে মানা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী।

 

রাজধানীর মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার মধ্য পীরেরবাগ এলাকার করোনার প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সরকার সমর্থক স্থানীয় নেতারা। জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে প্রকৃত দুস্থ ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ ও কয়েক দিন ধরে তালিকা তৈরির পর এলাকার এক নেতার বাড়িতে ডাকাও হয় সবাইকে। কিন্তু ত্রাণ বিতরণের নির্ধারিত সময় গত রোববার  দুপুরে যে পরিমাণ মানুষের সমাগম হয় সেখানে, তা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। উল্টো মারামারি করেও ত্রাণসামগ্রী না পেয়ে ফেরত যেতে হয়েছে অনেককেই।

এমন চিত্র ঢাকা মহানগরীর অনেক স্থানেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায়ই জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনৈতিক-সামাজিক নেতারা করোনা সংকটে কাজ হারানো অসহায় মানুষের পাশে এসে দাঁড়ালেও অনেক স্থানেই ত্রাণ কার্যক্রম চলছে অপরিকল্পিতভাবে। অনেক স্থানে রীতিমতো জনসমাগম ঘটিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর কারণে করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধে ‘সামাজিক দূরত্ব’ তথা বিচ্ছিন্নতার সাধারণ সূত্রও উপেক্ষিত হচ্ছে রীতিমতো। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার ত্রাণ বিতরণেও একই চিত্র দেখা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ অবস্থায় করোনা প্রতিরোধে সমাজের খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানের পরই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মানুষ এগিয়ে এসেছেন- এটি ঠিক। দিনমজুর ও ছিন্নমূল অসহায় মানুষের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণও করা হচ্ছে। এতে কিছুটা হলেও উপকৃত হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে গণজমায়েতের বিষয়টি মাথায় না রাখায় করোনার ঝুঁকি আরও বেড়ে চলেছে। সুনির্দিষ্ট তালিকার ভিত্তিতে প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় মানুষকে চিহ্নিতকরণ এবং তাদের ঘরে ঘরে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার তাগিদও দিয়েছেন তারা।

হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে  বলেন, এভাবে জমায়েত ঘটিয়ে খাদ্যসামগ্রী বিতরণে হয়তো নিম্ন আয়ের মানুষের উপকার হবে, তবে সেইসঙ্গে চরম বিপদের আশঙ্কাও তৈরি হবে। কারণ, এখন এমন এক মুহূর্ত যেখানে সামাজিক দূরত্ব তৈরি করাই করোনা প্রতিরোধের প্রধান এবং একমাত্র উপায়। সুতরাং পেটের ক্ষুধা নিবারণ করতে গিয়ে জীবন বিপন্ন হওয়ার বিপদ এড়িয়ে চলতে হবে।

তিনি বলেন, যারা কর্মহীন অসহায় মানুষকে খাবার বিতরণ করছেন, তাদের উচিত খোঁজখবর নিয়ে ও তালিকা করে ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া। এক্ষেত্রে স্থানীয় কাউন্সিলর বা জনপ্রতিনিধি যারা আছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। কারণ, এলাকায় কারা সংকটে আছেন, তারাই ভালো জানবেন। ঢাকা মহানগরীর দুই সিটি করপোরেশনেরও এভাবে ত্রাণ বিতরণ করা উচিত।

জানা গেছে, ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ১২৯টি ওয়ার্ডের কোথাও না কোথাও প্রতিদিনই ত্রাণসামগ্রী অথবা করোনা প্রতিরোধ সামগ্রী বিতরণ চলছে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতা, স্থানীয় এমপি অথবা ওয়ার্ড কাউন্সিলররা কর্মহীন মানুষের মধ্যে চাল, ডাল, তেলসহ খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছেন। অনেক সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পাশাপাশি বিত্তবান ব্যক্তিরাও নিজেদের উদ্যোগে ত্রাণ কার্যক্রমে নেমেছেন। কিন্তু প্রতিদিনই ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে ব্যাপক গণজমায়েত হচ্ছে। কোথাও কোথাও অধিক মানুষের ভিড়ের কারণে প্রায়ই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টিও হচ্ছে। এমনকি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে টিসিবির খোলা ট্রাকে করে ন্যায্যমূল্যের পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও ‘সামাজিক দূরত্ব’ নীতি মানা হচ্ছে না। গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিন কয়েকটি এলাকায় টিসিবির ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম ঘুরে দেখা গেছে, অনেক মানুষই গাড়ির সামনেও গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে পণ্য নিচ্ছেন।

এর আগে করোনাভাইরাসের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া ছিন্নমূল ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি শুরু করেছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিদায়ী মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। গত শনিবার মাসব্যাপী এ কর্মসূচির উদ্বোধনও করেন তিনি। তবে প্রথম দিনেই ব্যাপক জমায়েত হওয়াসহ ত্রাণ নিয়ে কাড়াকাড়ির কারণে একপর্যায়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। এখন ওয়ার্ডভিত্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকা করে ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ সিটি করপোরেশন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের বলেন, এভাবে আসলে ত্রাণ বিতরণ করা ঠিক নয়, যেখানে গণজমায়েত হয়। তবে তারা চেষ্টা করেছিলেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে। কিন্তু বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার পরই তারা এ কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন তারা মাসব্যাপী খাদ্যসামগ্রী বিতরণের জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি করছেন। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪৯টির তালিকা তৈরি হয়েছে। এ তালিকার ভিত্তিতে ছিন্নমূল কর্মহীন মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হবে।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

x