বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শামীম খানঃ

ও বৌ ধান ভানেরে/ঢেঁকিতে পার দিয়া/ ঢেঁকি নাচে বউ নাচে/ হেলিয়া, দুলিয়া/ ও বৌ ধান ভানেরে পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের ঢেঁকি নিয়ে এই কবিতা এখনো থাকলেও নানান স্মৃতির এই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে এক সময় ঢেঁকিতে ধান ভানা, চিঁড়া কুটা আর চালের গুঁড়া কুটার দৃশ্য সবসময়ই চোখে পড়তো।

কিন্তু কালের বিবর্তন আর আধুনিকতার ছোয়ায় গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একসময়ের খাদ্যদ্রবাদি মাড়াইয়ের অন্যতম মাধ্যম ঢেঁকি। বর্তমানে মানুষের প্রযুক্তি নির্ভরতা এবং কর্মব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় ঢেঁকির ব্যবহার এখন নেই বললেও চলে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে এক সময়কার গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য। পাল্টে গেছে গ্রামের চিত্র।

এই আধুনিক যন্ত্রপাতি আর প্রযুক্তির আড়ালে চাপা পড়ে গেছে গ্রামের সেই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। এখন ঢেঁকির আর দেখাই মেলে না। ‘ধান ভানি রে, ঢেঁকিতে পার দিয়া। ঢেঁকি নাচে আমি নাচি, হেলিয়া-দুলিয়া। ধান ভানি রে।’ গ্রাম-বাংলার তরুণী-নববধূ, কৃষানিদের কণ্ঠে এ রকম গান এখন আর শোনা যায় না। বিভিন্ন ধরনের যন্ত্র আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে সেসব পুরনো ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। কালের বিবর্তনে ঢেঁকি এখন শুধু ঐতিহ্যের স্মৃতি বহন করে। দিন দিন ঢেঁকি শিল্প বিলুপ্ত হলেও একে সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই।

একসময় ভোরে আজানের সাথে সাথে স্তব্ধতা ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত ঢেঁকির শব্দ। পরিবারের নারীরা সে সময় দৈনন্দিন ধান, গম ও যব ভাঙার কাজ ঢেঁকিতেই করতেন। পাশাপাশি চিড়া তৈরির মতো কঠিন কাজও ঢেঁকিতেই করা হতো। বিশেষ করে শবে বরাত, ঈদ, পূজা, নবান্ন উৎসব, পৌষ পার্বণসহ বিশেষ বিশেষ দিনে পিঠা-পুলি খাওয়ার জন্য অধিকাংশ বাড়িতেই ঢেঁকিতে চালের আটা তৈরি করা হতো।

সে সময় গ্রামের বধূদের ধান ভানার গান আর ঢেঁকির ছন্দময় শব্দে চারদিকে হৈচৈ পড়ে যেত। তাছাড়া ওই সময় এলাকার বড় কৃষকরা আশপাশের দরিদ্র নারীদের টাকা বা ধান দিয়ে ঢেঁকিতে চাল ও আটা ভাঙিয়ে নিতেন। অনেক দরিদ্র পরিবার আবার ঢেঁকিতে চাল ভাঙিয়ে হাট-বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করত। ঢেঁকিতে ভাঙা পুষ্টিকর এবং সু¯^াদু চালের বেশ কদর ছিল।

ধান-গম ভাঙা যন্ত্র আবিষ্কারের কারণে এক সময়ের নিত্য প্রয়োজনীয় ঢেঁকি আজ বিলুপ্ত প্রায়। সভ্যতার প্রয়োজনে ঢেঁকির আবির্ভাব ঘটেছিল। আবার গতিময় সভ্যতার যাত্রাপথে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

মহেশপুর পৌর এলাকার পাতিবিলা গ্রামের মনোয়ারা বেগম বলেন, বিয়ের পর থেকেই ঢেঁকি দিয়ে বিভিন্ন খাদ্যদ্রবাদি মাড়াই করেছি। আগে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ঢেঁকিতে চালের আটা তৈরি করতে আসত। কিন্তু এখন আর তেমন কেউ আসে না। এখন সবাই মেশিনে চাল মাড়াই করে।

সুফিয়া খাতুন বলেন,এক সময় গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল এই ঢেঁকি। তখন কদরও ছিল। এখন প্রতিটি বাড়িতে তো দূরের কথা, কয়েকটি গ্রাম মিলিয়ে একটি বাড়িতেও ঢেঁকি পাওয়া অসম্ভব।

শহিদুল ইসলাম বলেন,হাতের কাছে বিভিন্ন যন্ত্র আর প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ায় ঢেঁকির মতো ঐতিহ্যবাহী অনেক কিছুই এখন হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময় হয়তো সেসবের দেখা মিলবে কেবল জাদুঘরে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

x