বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের স্বপ্নের সিঁড়ি সুখাতি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়

Spread the love
  • 2
    Shares

হাফিজুর রহমান হৃদয়, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:

প্রতিবন্ধীদের ভালোবাসাপূর্ণ স্বপ্নের ভুবন আলমগীরের সুখাতি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিজম বিদ্যালয়। উপজেলার নেওয়াশী ইউনিয়নের সুখাতী (গিড়াইপাড়) এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টির ভৌত অবকাঠামোসহ ভিতরের মনোরম ও ব্যাতিক্রমী পরিবেশ যে কারো মন কেরে নেবে।

প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসাইন জানান, সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত প্রতিবন্ধীরা। তাদেরকে সবাই বোঝা মনে করেন। এদের অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তির সাথেও জরিত। তাদের সাথে ভালো আচরণ করে না অধিকাংশই। অযতœ অবহেলাই যেনো তাদের ভাগ্যের লেখা।

তাই সমাজের এমন সব অবহেলিত এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ¯^াভাবিক করে সমাজের মূল জন শ্রোতের সাথে সম্পৃক্ত করে তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন নিশ্চিৎ করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ২০১৫ সালে ১৫-১৬ জন প্রতিবন্ধী শিশু কিশোর খুঁজে নিয়ে একটি ভাড়া ঘরে যাত্রা শুরু করেন।

এতে করে তেমন ফলাফল না পাওয়ায় এলাকার কিছু বেকার যুবককে সাথে নিয়ে তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলেন। তার দাদার জমিতে স্কুল ঘর করে ২০১৭ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে যাত্রা শুরু করেন। এখন এ প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ১১০ জন। তাদেরকে শিক্ষা দীক্ষায় স্বাভাবিক করার জন্য রয়েছে শিক্ষক, গাইড টিচার, ডাক্তার, ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, স্পিস এ্যান্ড লেংগুয়েজ থেরাপিস্টসহ ২৪জন স্টাফ।

অটিজম, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীতা, আচরণগত সমস্যা, বিলম্বে কথা বলা, বিলম্বে বিকাশ, সেন্সরি ডিস অর্ডার, সেরিব্রাল পাল্সি, ডাউন সিন্ডোম,  অতিচঞ্চল, ও অস্থিরতা সম্বলিত বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা প্রশিক্ষণ ও থেরাপি ভিত্তিক সমšি^ত এই স্কুলটির প্রতিটি ক্লাসেই রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন। প্রতিবন্ধীদের ব্যায়াম, শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে যাবতীয় শিক্ষা পদ্ধতিই চোখে পড়ার মতো।

শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশকে তরাšি^ত করার জন্য রয়েছে অকুপেশনাল থেরাপি, শরিরিক সমস্যাযুক্ত বাচ্চাদের ফিজিওথেরাপি, অনুভুঁতির সমস্যাজনিত শিশুদের জন্য সেন্সরি ইন্টিগ্রেশন থেরাপি, মানসিক সমস্যার জন্য সাইকোলজিক্যাল থেরাপি ইত্যাদি। এছাড়াও শিশুদের শারিরীক, মানসিক ও মেধা বিকাশ ও বিনোদনের জন্য রয়েছে ড্যান্স ও ইয়োগা থেরাপি, আর্ট থেরাপি, গ্রুপ থেরাপি।

এমনকী তাদেরকে ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে কর্মমূখী করার শিক্ষাও প্রদান করা হয়। শুধু তাই নয় যারা দৈনন্দিন কাজ করতে পারে না তাদের জন্য রয়েছে ডেইলি লিভিং এক্টিভিটি ট্রেনিং। প্রত্যেক বাচ্চার জন্য আলাদা আলাদা পরিকল্পনার মাধ্যমে তৈরি করে কাজ করা হয়। এছাড়াও সকল বয়সী মানুষের জন্য রয়েছে বহির্বিভাগ থেরাপি।  বিশেষ করে ১ঃ১ পদ্ধতির শিক্ষা অর্থাৎ একজন শিশুর জন্য একজন শিক্ষকের শিক্ষাদান যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা।

তবে প্রতিষ্ঠানটি চালাতে গিয়ে আর্থিক দিক থেকে অনেক বেগ পোহাতে হচ্ছে আলমগীরকে। শিশুদের চিকিৎসা, ঔষধ প্রদান, দুপুরের নাস্তা, প্রতিদিনের খেলার সামগ্রী, থেরাপি সরঞ্জাম, শিক্ষকদের হালকা সম্মানিসহ তার প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১লাখ টাকা। আয় বলতে হালকা ফি। এতে করে মাসে তার বড়জোর ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা আসে।

প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী শিশুর অভিভাবক ডা. মিজানুর রহমান জানায়, তার ছেলের সেরিকবাল পাল্সি সমস্যা রয়েছে। ঢাকা ও রংপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বড় বড় ডাক্তার দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু তাতে কোনো কাজে আসেনি তার। পরে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী স্পোশাল এই স্কুলে ভর্তি করান। এখন বাচ্চার অনেক উন্নতি দেখতে পাচ্ছেন। একইভাবে আতিকুল আবেদিন নামের আরেক অভিভাবক জানায় তার সন্তান বাক ও শ্রবণ সমস্যায় ভুগছিলো। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেও উন্নতি দেখতে না পেয়ে এখানে দিয়েছেন। এখানেই আলোর মুখ দেখছেন তিনি।

এ ব্যাপারে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুকুমার চন্দ্র বর্মণ ও রেশমা খাতুন জানায়, এখানে পড়াতে গিয়ে প্রথমে কঠিন মনে হলেও এখন আর তেমন কঠিন মনে হয় না। স্বেচ্ছাশ্রমেই কাজ করছেন। এমন অস্বাভাবিক শিশুদের নিয়ে কাজ করে আত্মতৃপ্তিবোধ করেন তারা।

প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসাইন বলেন, পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায় প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাদের সেবা করার দিকে তেমন কেউ নজর দেয় না। সেদিকটা বিবেচনা করে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে বহুদিনের। তাই তিনি সারাজীবন অসহায় প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করতে চান। এজন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

x