মসজিদে নামাজ সংক্ষিপ্ত করার সরকারি নির্দেশ কতটুকু শরিয়ত সম্মত?

Spread the love
  • 33
    Shares

আবদুল মান্নানঃ
গত ৬/৪/২০২০ ইং তারিখে বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমাত নামাজ মসজিদে আদায় বিষয়ে এক বিধি-নিষেধ জারি করেন।নোভেল করোনা ভাইরাস(কোভিড-১৯) মোকাবিলায় এই আপদ কালীন সময়ে মসজিদে নামাজ আদায় না করে বাড়ীতে আদায়ের নির্দেশনা জারি করেন।

সরকারের এই বিধি-নিষেধ কুরআন ও হাদীসের আলোকে কতটুকু বৈধ এ নিয়ে বিশদ আলোকপাত নিন্মে উপস্থাপন করা হল।

♧উল্লেখ্য যে, এ ধরণের আপদ কালীন সময়ে মসজিদে নামাজ সংক্ষিপ্ত করার কোনো নির্দেশনা কুরআন ও রাসুল(সা:) এর হাদিস অথবা সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্ৰমাণ পাওয়া গেলে সরকারের সেই নিৰ্দেশনা বৈধ। অন্যথা বৈধ নয়।

♧ এ বিষয়ে কুরআনের কিছু নির্দেশনা হল।

আল্লাহ পাক বলেন;
, ولا تلقوا بأيديكم إلي التهلكة. واحسنوا إن الله يحب المحسنين.
অর্থাৎ, তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করবেনা। আর তোমরা দয়া/সৎ কাজ সম্পাদন কর। নিশ্চয় আল্লাহ সৎ কাজ সম্পাদন কারিদের পছন্দ করেন। (বাকারা-১৯৫)
আল্লাহ আরো বলেন,
لا تكلف الله نفسا الا وسعها
অর্থাৎ,আল্লাহ কোন মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে কোন কিছু চাপিয়ে দেননা।
৩_ আল্লাহ বলেন;
ولا تقتلوا انفسكم.إن الله كان بكم رحيما.
অর্থাৎ; তোমরা নিজেদের হত্যা করনা। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে দয়াশীল।( আল-নিসা-২৯)

৪_ শরীয়তের মূলনীতি হল; لا ضرر ولا ضرار বা, কারো ক্ষতি করা যাবেনা আর ক্ষতি সহা ও যাবেনা।

♧ নিম্নে এ নিয়ে কয়েকটি হাদিস উপস্থাপন করা হলো;
১_ইবনে আব্বাস(রা:) বলেন;

حَدَّثَنَا مُسَدَّدٌ، حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، أَخْبَرَنِي عَبْدُ الْحَمِيدِ، صَاحِبُ الزِّيَادِيِّ حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ الْحَارِثِ ابْنُ عَمِّ، مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ، قَالَ لِمُؤَذِّنِهِ فِي يَوْمٍ مَطِيرٍ إِذَا قُلْتَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ‏.‏ فَلاَ تَقُلْ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ ‏.‏ قُلْ صَلُّوا فِي بُيُوتِكُمْ ‏.‏ فَكَأَنَّ النَّاسَ اسْتَنْكَرُوا ذَلِكَ فَقَالَ قَدْ فَعَلَ ذَا مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنِّي إِنَّ الْجُمُعَةَ عَزْمَةٌ وَإِنِّي كَرِهْتُ أَنْ أُحْرِجَكُمْ فَتَمْشُونَ فِي الطِّينِ وَالْمَطَرِ ‏.‏

অর্থাৎ মুহাম্মাদ ইবন সিরীনের চাচাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনুল হারিস (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ: একদা বৃষ্টির দিনে ইবনু আব্বাস (রাঃ) তার মুয়াযযিনকে বললেন, আযানের মধ্যে তুমি যখন “আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ” বলবে তখন এরপর “ حي علي الصلوة” বলবে না। বরং বলবেঃ ‘صلوا في بيوتكم বা, তোমরা নিজ নিজ ঘরে সালাত আদায় করো। লোকেরা এটাকে অপছন্দ করলে ইবনে আব্বাস (রাঃ) বললেন; আমার চাইতে উত্তম যিনি তিনি (সা:)ও এরূপ করেছেন। নিঃসন্দেহে জুমু’আহর সালাত ওয়াজিব। কিন্তু এরূপ কাদা ও বৃষ্টির মধ্যে তোমাদের হেঁটে আসতে বা ঘর হতে বের করতে আমি পছন্দ করি নাই।
{(বুখারী-৯০১ ও মুসলিম-১৪৮৯)(আবু দাউদ-১০৬৬, লু-লু ওয়াল মারজান-৪০৫)(হাদিসের মান: সহিহ)}

উক্ত হাদিস দ্বারা প্রমানিত হয় যে, মুফাস্সির কুল শিরোমণি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রা:) নিজের মুয়াজ্জিন কে বৃষ্টির দিনে আজানে শব্দ সংযোজন ও বাড়িতে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে রাসুল(সা:) কতৃক এ রকম নির্দেশনা আছে বলে দ্ব্যার্থ ভাষায় প্রকাশ করেন।

নিম্নোক্ত হাদিসে ও বাড়িতে নামাজ আদায়ের নির্দেশ ২_বিশ্বনবী (সা:)। তিনি (সা:) বলেন;

وَحَدَّثَنَا ابْنُ الْمُثَنَّى، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْوَهَّابِ، أَخْبَرَنَا أَيُّوبُ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ صَلُّوا فِي بُيُوتِكُمْ وَلاَ تَتَّخِذُوهَا قُبُورًا ‏”‏ ‏.

অর্থাৎ ; ‘আবদুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন; নবী(সা:)এরশাদ করেন; তোমরা বাড়িতে ও সালাত(নামাজ) আদায় কর। বাড়ি গুলোকে কবর বানিয়ে রেখনা। {(মুসলিম-১৭০৬)
(ই. ফ. ১৬৯১, ই.সে. ১৬৯৮)( হাদিসের মান: সহিহ)}

উক্ত হাদিস টি ইমাম তিরমিযি(রাহ:) “জামে আত-তিরমিযি” কিতাবে একেই বর্ণণাকারি ইবনে উমর(রা:)হতে বৰ্ণনা করে মন্তব্য করেন যে;

‏.‏ قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ ‏.
অৰ্থাৎ; এই হাদিস হাসান, সহিহ।{(তিরমিযি-৪৫১)
(আবূ দাঊদ-৯৫৮, ১৩০২)( বুখারী ও মুসলিম)}

♧ শুধু বাড়িতে কেন এ রকম প্রচন্ড ঠান্ডা ও দূর্যোগে কালীন মূহুর্তে বাহন, গাড়ী কিংবা যে যেখানে আছেন সেখানে নামাজ আদায় করা উত্তম।
৩_ইবনে উমর(রা:)বলেন;

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ نُمَيْرٍ، حَدَّثَنَا أَبِي، حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ، حَدَّثَنِي نَافِعٌ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّهُ نَادَى بِالصَّلاَةِ فِي لَيْلَةٍ ذَاتِ بَرْدٍ وَرِيحٍ وَمَطَرٍ فَقَالَ فِي آخِرِ نِدَائِهِ أَلاَ صَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ أَلاَ صَلُّوا فِي الرِّحَالِ ‏.‏ ثُمَّ قَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَأْمُرُ الْمُؤَذِّنَ إِذَا كَانَتْ لَيْلَةٌ بَارِدَةٌ أَوْ ذَاتُ مَطَرٍ فِي السَّفَرِ أَنْ يَقُولَ أَلاَ صَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ ‏.

অর্থাৎ; আবদুল্লাহ ইবনু উমার থেকে বর্ণিত;তিনি শীত ও ঝড়-বৃষ্টি কবলিত এক রাতে সালাতের আযান দিলেন। তিনি তার আযানে শেষে উচ্চস্বরে বলেন, শোন! তোমরা নিজ নিজ অবস্থানস্থলে সালাত আদায় করে নাও। শোন! তোমরা নিজ নিজ অবস্থানস্থলে সলাত আদায় করে নাও। অতঃপর তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা:) সফররত অবস্থায় শীত বা বর্ষণমুখর রাতে মুয়ায্‌যিনকে নির্দেশ দিতেন, সে যেন বলে, শোন! তোমরা নিজ নিজ অবস্থানে সালাত আদায় করে নাও।{(মুসলিম-১৪৮৬,বুখারি-৬৩২) হাদিসের মান: সহীহ }

তবে আযানের সময়, صلوا في بيوتكم/ صلوا في رحالكم এই শব্দ গুলো একবারের অধিক বলা যাবেনা। নিন্মোক্ত হাদিস তার দলিল।
৪_ইবন উমর(রা:) বলেন;

وَحَدَّثَنَاهُ أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، حَدَّثَنَا عُبَيْدُ اللَّهِ، عَنْ نَافِعٍ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ، أَنَّهُ نَادَى بِالصَّلاَةِ بِضَجْنَانَ ثُمَّ ذَكَرَ بِمِثْلِهِ وَقَالَ أَلاَ صَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ ‏.‏ وَلَمْ يُعِدْ ثَانِيَةً أَلاَ صَلُّوا فِي الرِّحَالِ ‏.‏ مِنْ قَوْلِ ابْنِ عُمَرَ ‏.

অর্থাৎ ;‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত একবার তিনি ‘যজনান’ নামক স্থানে সালাতের আযান দিলেন। এ পর্যন্ত বর্ণনা করার পর তিনি উপরে বর্ণিত হাদীসের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করলেন। তবে এতটুকু কথা অধিক বর্ণনা করলেন যে, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার বললেন, তোমরা যার যার অবস্থান স্থলেই সালাত আদায় করে নাও। ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার- বলেন, “তোমরা যার যার অবস্থান স্থলেই সলাত আদায় করে নাও” কথাটি দ্বিতীয়বার বললেন না।
{(মুসলিম-১৪৮৭) (ই:ফা ১৪৭২, ই.সে. ১৪৮০)হাদিসের মান:সহীহ।}

৫_আমর ইবন আউস(রা;) বলেন;

أَخْبَرَنَا قُتَيْبَةُ قَالَ: حَدَّثَنَا سُفْيَانُ، عَنْ عَمْرِو بْنِ دِينَارٍ، عَنْ عَمْرِو بْنِ أَوْسٍ يَقُولُ: أَنْبَأَنَا رَجُلٌ مِنْ ثَقِيفٍ، أَنَّهُ سَمِعَ مُنَادِيَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – يَعْنِي فِي لَيْلَةٍ مَطِيرَةٍ فِي السَّفَرِ – يَقُولُ: «حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ. حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ. صَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ»

অর্থাৎ; আমর ইব্‌ন আওস (রাঃ) থেকে বর্ণিত;তিনি বলেন : আমার নিকট সাকীফ গোত্রের এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, তিনি সফর অবস্থায় বর্ষার এক রাতে নবী (সা:) এর ঘোষককে বলতে শুনেছেন : (صلوا في رحالكم ) বা তোমরা নিজ স্থানে সালাত আদায় কর।
{(সুনানে আন-নাসায়ী-৬৫৩)(আবু দাউদ-১০৬২, ইবনে মাজাহ-৯৩৬-৩৭-৩৮) (হাদিসের মান: সহিহ)}

♧ তাছাড়া শরীয়তের মূলনীতি হল;যেসব ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ (রুখসত) দান করেছে, সেখানে মূল বিধান (আযীমত)কে আঁকড়ে ধরা উচিত নয়।

৬_রাসূল( সা:) বলেন,
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى رُخَصُهُ، كَمَا يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى عَزَائِمُهُ

অর্থাৎ,আল্লাহ পাক যেমন তাঁর আযীমতসমূহ (স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়মিত অনুসৃত মূল বিধানসমূহ) পালন ও অনুসরণ পছন্দ করেন, তেমনি তাঁর রুখসতসমূহ (বিশেষ বিশেষ অবস্থার জন্য ছাড় ও সুবিধাগুলো) গ্রহণ ও পালনও পছন্দ করেন। (ইবনু-হিব্বান)

♤ ইবনু হাজর আসকালানী(রাহ.) বলেন,
إن الأخذ بالعزيمة في موضع الرخصة تنطع كمن ترك التيمم عند العجز عن استعمال الماء فيفضي به استعماله إلى حصول الضرر

“শরীয়তে যেসব ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় রয়েছে, সেখানে মূল বিধানকে আঁকড়ে ধরা এক প্রকারের বাড়াবাড়ি। যেমন কেউ পানি ব্যবহারে অক্ষম হওয়া সত্ত্বেও তায়াম্মুম করা ছেড়ে দেয় এবং এ কারণে সে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। (ফাতহুল বারী)

এ রকম আপদকালীন সময়ে বাড়িতে ইবাদত করলে ও মসজিদে ইবাদতের সমপরিমান সাওয়াব পাওয়া যাবে।
৭_রাসুল(সা:) বলেন;

حَدَّثَنَا مَطَرُ بْنُ الْفَضْلِ حَدَّثَنَا يَزِيْدُ بْنُ هَارُوْنَ حَدَّثَنَا الْعَوَّامُ حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيْمُ أَبُوْ إِسْمَاعِيْلَ السَّكْسَكِيُّ قَالَ سَمِعْتُ أَبَا بُرْدَةَ وَاصْطَحَبَ هُوَ وَيَزِيْدُ بْنُ أَبِيْ كَبْشَةَ فِيْ سَفَرٍ فَكَانَ يَزِيْدُ يَصُومُ فِي السَّفَرِ فَقَالَ لَهُ أَبُوْ بُرْدَةَ سَمِعْتُ أَبَا مُوسَى مِرَارًا يَقُوْلُ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَوْ سَافَرَ كُتِبَ لَهُ مِثْلُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيْمًا صَحِيْحًا

অর্থাৎ; আবূ বুরদাহ্‌-কে বলতে শুনেছি, তিনি এবং ইয়াযিদ ইব্‌নু আবূ কাবশা (রাঃ) সফরে ছিলেন। আর ইয়াযিদ (রাঃ) মুসাফির অবস্থায় রোযা রাখতেন। আবূ বুরদাহ (রাঃ) তাঁকে বললেন, আমি আবূ মুসা (আশ’আরী) (রাঃ)- কে একাধিকবার বলতে শুনেছি,তিনি বলেন, আল্লহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যখন বান্দা পীড়িত হয় কিংবা সফরে থাকে, তখন তাঁর জন্য তা-ই লেখা হয়, যা সে সুস্থ অবস্থায় ‘আমল করত।
(সহিহ বুখারী-২৯৯৬_হাদিসের মান: সহিহ হাদিস)

♧ সুতরা, উল্লেখিত কুরআনের আয়াত,হাদিস সমূহ, সাহাবায়ে কেরামের আমল ,শরিয়তের মূলনীতি ও ইমামদের মতামত থেকে প্রতীয়মান হয় যে,
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস(কোভিড-১৯)এর বিষাক্ত থাবা থেকে মুক্তি লাভের আশায় সরকার কতৃক মসজিদে নামাজ সংক্ষিপ্ত করার নিৰ্দেশ পরিপূর্ণ শরিয়ত সম্মত। এ নির্দেশ পালন করা প্রত্যেক মুসলিমের এই সংকট মূহুর্তে ঈমানী দায়িত্ব।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

x