সরকারি অনুদান চায় কওমি মাদরাসা

Spread the love

নজিরবিহীন আর্থিক সংকটে পড়েছে বেসরকারি অনুদানে পরিচালিত কওমি মাদরাসাগুলো। শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছে না অধিকাংশ মাদরাসা।প্রথমবারের মতো কওমি মাদরাসাগুলোও সরকারি অনুদান চেয়েছে। সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা বা অন্যকোনও আর্থিক সুবিধা না নেয়াই কওমি মাদরাসা অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা রয়েছে। জন্মলগ্ন থেকে তারা এই বৈশিষ্ট্য ধরে রাখলেও করোনা মহামারিতে তারা সেই বৈশিষ্ট্য ক্ষুন্ন করে সরকারের সহায়তা চেয়েছে।

এদিকে আকস্মিকভাবে মাদরাসাবন্ধ হওয়ায় বহু দরিদ্র শিক্ষার্থীকে ছাত্রাবাস ছাড়তে হয়েছে, তাদের বড় অংশ রয়েছে খাদ্য সংকটে। ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত ছোট মাদরাসাগুলোও আর্থিক অনটনে স্থায়ীভাবে বন্ধের আশঙ্কায় রয়েছে। প্রায় ১৫০ বছরের ইতিহাসে কওমি মাদরাসাগুলো কখনও সরকারি অনুদান না নিলেও এই অভূতপূর্ব সংকট কাটাতে অর্থ সহায়তা চেয়েছে।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, কওমি মাদরাসাগুলো নিজেদের সিদ্ধান্তেই কখনও সরকারি অনুদান নেয়নি। কিন্তু করোনার কারণে প্রতিটি মাদরাসাগুরুতর সংকটে পড়েছে। তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো হয়েছে। তিনি মাদরাসার তালিকা করে সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন। তালিকার কাজ চলছে। এরপর সরকারের পক্ষে যতটা সম্ভব সহায়তা করা হবে।

ছয় শিক্ষা বোর্ডের একটি জাতীয় দ্বীনি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলেন, ‘অতীতে কখনও করোনার মতো সংকট আসেনি। তাই সরকারি অনুদান নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। করোনার কারণে পুরো বিশ্বই বিপর্যয়ের মুখে। এ পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মাদরাসাই শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছে না। তাই এখন সরকারি অনুদান প্রয়োজন।’ মাওলানা মাসঊদ বলেন, এ নিয়ে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকেও মাদরাসার দুরবস্থার কথা জানানো হয়েছে। সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস মিলেছে। ছোট-বড় প্রায় সব মাদরাসারই সহায়তা প্রয়োজন।

সংসদে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, দেশে কওমি মাদরাসার সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৯৭। শিক্ষার্থী ১৮ লাখ। তবে কওমি সংশ্নিষ্টদের দাবি, মাদরাসার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। শিক্ষক সংখ্যা এক লাখের মতো। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২২ লাখের বেশি। সারাদেশে ছয়টি আঞ্চলিক বোর্ডের অধীনে কওমি মাদরাসাপরিচালিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বোর্ড বেফাকুল মাদ্রাসিল আরাবিয়া (বেফাক)। এর অধীনে রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার মাদরাসা। ছয় বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত ‘আল-হাইয়াতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের’ অধীনে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দিয়েছে সরকার। এই আইনের ২(১) ধারায় কওমি মাদরাসার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ‘… জনসাধারণের আর্থিক সহায়তায় উলামায়ে কেরামে প্রতিষ্ঠিত ইলমে ওহীর শিক্ষা কেন্দ্র’।

১৮৬৬ সালে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় কওমি মাদরাসা। ২০১৮ সালে দাওরায়ে হাদিসকে স্নাতকোত্তরের সমমান দেওয়ার আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় কওমি নেতারা দেওবন্দের আদলে স্বতন্ত্র ও স্বকীয়তা বজায় রাখতে সরকারের আর্থিক অনুদান নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

কওমি মাদরাসাসংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, অধিকাংশ মাদরাসার সারা বছরের পরিচালনা ব্যয়ের বড় অংশ আসে রমজান মাসে। এ সময়ে সবাই জাকাত-সদকা দেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। করোনার কারণে সব মাদরাসা গত ১৮ মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ। তাই রোজায় আগে যে অনুদান মিলত, এবার তা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, সাধারণ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, বহু মানুষ অনুদান দেওয়ার সামর্থ্য হারিয়েছেন। তাই মাদরাসাপরিচালনার ব্যয় সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গোপালগঞ্জের গহরডাঙ্গার জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম খাদেমুল ইসলাম দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম কওমি মাদরাসা। এ মাদরাসায় দুই হাজার ৫২৭ জন ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করেন।

প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষক জানান, মাদরাসাপরিচালনায় বছরে ১৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়। যার বড় অংশই আসে রমজানে। কিন্তু এবার রমজানে প্রত্যাশিত অঙ্কের অনুদান পাওয়া যাবে না।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ মাদরাসাপরিচালিত হয় বেফাকুল মাদ্রাসিল কওমিয়া বোর্ডের অধীনে। এ বোর্ডের সভাপতি মাওলানা মুফতি রহুল আমিন বলেন, কওমি মাদরাসা সরকারের কাছে নিয়মিত বরাদ্দ নয়, আপৎকালীন অনুদান প্রত্যাশা করছে। বেফাকের সভাপতি আল্লামা শাহ আহমদ শফী গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অনুদানের বিষয়ে তাই তার বক্তব্য জানা যায়নি। বেফাক নেতারা বরাবরই কওমি মাদরাসায় সরকারি অনুদানের বিরোধী। করোনার দুরবস্থায় তাদের অনেকে অবস্থান পরিবর্তন করলেও কেউ গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি। বেফাকের কেউ অনুদানের বিষয়ে কথা না বললে এ ঘরানার সংশ্নিষ্ট তাফসির পরিষদের সভাপতি চেয়ারম্যান মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ূম বলেছেন, সরকার বিভিন্ন পেশার মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের পাশেও দাঁড়ানো উচিত।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

x